Monday, July 24, 2017

ছন্দকলা / ড. মোহাম্মদ আমীন


ছন্দ: যে বিশেষ রীতিতে পদবিন্যাস করলে বাক্য শ্রুতিমধুর হয় তাই ছন্দ। মূলত শিল্পিত বাকরীতির নামই ছন্দ।দল বা অক্ষর: বাকযন্ত্রের প্রয়াসে একঝোঁকে শব্দের যতটুকু উচ্চারিত হয় তাকে দল বা অক্ষর বলে।
কলা: উচ্চারিত ধ্বনির ক্ষুদ্রতম অংশের পারিভাষিক নাম কলা। মুক্ত ও রুদ্ধ উভয়প্রকার দলই অপ্রসারিত উচ্চারণে এক কলা এবং প্রসারিত উচ্চারণে দুই কলা বলে গণ্য হয়।
মাত্রা: কোন বস্তুর পরিমাপের আদর্শ মানকে বলা হয় মাত্রা। বাংলায় এক বিশেষ রীতিতে ছন্দের পরিমাপের একককে বলা হয় মাত্রা। মাত্রা নির্ণিত হয় দলের বা কলার সংখ্যা অনুযায়ী। 

Saturday, July 22, 2017

বাংলা বানান / ড. মোহাম্মদ আমীন


কয়েকটি বহুল ব্যবহৃত শব্দের বানান/৩:

তিরস্কার, ত্বরান্বিত (তরান্বিত নয়), দণ্ডবৎ, দরুন, দারুণ, দামি, দায়ী, দারিদ্র্য, দরিদ্রতা,
দিগ্‌ভ্রম,দিগ্‌ভ্রান্ত, দিগ্‌হারা, দিঘি, দিঙ্‌নির্ণয় (দিক্‌নির্ণয় নয়), দিঙ্‌নির্দেশ,
দিঙ্‌নির্দেশনা, দিশারি,দীর্ঘসূত্রী, দুরুচ্চার্য, দুরূহ, দুর্গ, দুষ্কৃতকারী, দূর্বা (ঘাস),
দূষণীয় (দোষনীয় নয়), দৃক্‌পাত, দেওয়াল (দেয়াল নয়), দৌড়ঝাঁপ, 
দৌরাত্ম্য, দ্বন্দ্ব, ধনাঢ্য, ধরন, ধারণ, ধারণা, ধূমপান,
ধ্যানধারণা, ধ্বংসোন্মুখ, নগণ্য, নচেৎ,
নতুন, নূতন, নভশ্চর,
নয়তো, নাগাড়,
নানি।



কটূক্তি (কটুক্তি নয়), কণা, কণ্ঠস্থ, কত, কতগুলো, কথামতো, কথোপকথন, 
কদাচিৎ, কপর্দকশূন্য, কয়েক বার, কেরানি, করণিক, কর্তৃবৃন্দ, 
কর্মকর্তৃবৃন্দ, কাঁঠালচাঁপা,কল্যাণীয়াসু (মহিলার ক্ষেত্রে)
কল্যাণীয়েষু (পুরুষের ক্ষেত্রে),কাঙ্ক্ষিত, কাচ, কিম্ভূত, 
কূটনীতি, কূপ, কূলকিনারা, কৃচ্ছ্রতা (কৃচ্ছতা নয়), 
কেননা, ক্বচিৎ, ক্রূর, ক্ষান্ত, ক্ষুণ্ন, খুঁটিনাটি, 
খুনীখুশি, খেলাধুলা, খোঁজ, খোঁজখবর, 
খোঁয়াড়, গড্ডলিকা (গড্ডালিকা নয়), 
গণনা, গণপূর্ত,
গরিষ্ঠ।


নারায়ণ, নারায়ণগঞ্জ, নিয়মতান্ত্রিকভাবে, নিরীক্ষণ, নিরীহ, নির্ভীক, নিষ্প্রয়োজন, নীরোগ,
নীহারিকা, নূতন, নূপুর, নেহাৎ, নৈঃশব্দ্য (নৈঃশব্দ নয়), নৈঃসঙ্গ্য, ন্যস্ত, ন্যায্য,
ন্যায়, ন্যূন, ন্যূনতম, ন্যূনপক্ষে, পঁয়ষট্টি, পক্ব (পক্ক নয়), পঙ্‌ক্তি, পচা,
পড়াশুনো/পড়াশোন (পড়াশুনা নয়), পণ্ডিম্মন্যতা, হীনম্মন্যতা, পদবি,
পরপর, পরবর্তী কালে, পরবর্তী সময়ে,পরাঙ্মুখ (পরান্মুখ নয়), 
পরামর্শমতো, পরাস্ত, পরিবহণ, পর্যটনকেন্দ্র, পাশ্চাৎপদ,
পশ্চাৎপট, পশ্চাদ্‌গামী, পাণিনি, পিএইচ.ডি
পিপীলিকা, পীড়াপীড়ি।


পুজো/পুজা, পুনঃপুনঃ, পুরুষকণ্ঠ (কিন্তু পরুষ কণ্ঠ), পুষ্করিণী, পৃথক্করণ (পৃথকীকরণ নয়), পৃথগন্ন,
পোশাক, পোশাকআশাক, পৌনঃপুনিক, পৌরোহিত্য, প্রজ্বলন, প্রণিধান, প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রধানমন্ত্রী,
প্রবীণ, প্রাচীন, প্রশাসন-ভবন (প্রশাসনিক ভবন নয়), প্রশংসা, প্রাণপণ, প্রাণিজগৎ,
প্রিয়তমাসু (মহিলার ক্ষেত্রে), প্রিয়তমেষু (পুরুষের ক্ষেত্রে), প্রোজ্জ্বল,
ফলপ্রসূ, ফুরসত, ফুর্তি, স্ফূর্তি, বক্ষ্যমাণ, বন্দি, বধূ, 
বক্ষঃস্থল, (কিন্তু অন্তস্তল), বয়ঃকনিষ্ঠ,বয়ঃসন্ধি, 

গাঁথা (মালা গাঁথা), গাথা (কাহিনী), গার্হস্থ্য, গুণ, গুনে গুনে, গুলী (পিস্তলের)
গৃহবধূ, গৃহীত, গোধূলি, গোষ্ঠী, গোষ্পদ, ঘুঁটি (দাবার), ঘনিষ্ঠ, ঘাঁটি, ঘুণ,
ঘূর্ণি, ঘূর্ণ্যমান/ঘূর্ণায়মান, ঘোরাঘুরি, চলনশক্তিরহিত, চিক্কণ,
চিত্রাঙ্কণ, চূষ্য (চোষ্য নয়), ছাঁকনি, জগদ্বিখ্যাত,
জাগরূক, জাতীয়করণ, জাত্যভিমান, ঝুঁকিপূর্ণ,
ঢুঁ মারা, তক্ষুনি, তৎসংক্রান্ত, তত,
তদনুসারে (তদানুসারে নয়)
তর্জনী, তাঁতি, 
তাবৎ।


বাল্মীকি, বাহাদুরি, বারণ, বিদূষী, বিদ্বৎসমাজ, বিপণন, বিপৎসংকুল, বিপৎসংকেত,
বিপদ্‌গ্রস্ত, বিবদমান, বিভীষণ, বিভূতিভূষণ, বিশ্রী, বিশ্বজিৎ, বীথি, বুড়ি,
বুদ্ধিজীবী, বুভুক্ষ, বৈদগ্ধ্য, বৈদ্যুতীকরণ, ব্যবধান, ব্যভিচার, ব্যর্থ,
ব্যাকরণ, ব্রাহ্মণ, ভঙ্গ, ভণিতা, ভবিষ্যৎ, ভবিষ্যদ্বাণী,
ভরণপোষণ, ভস্ম (কিন্তু ভীষ্ম), ভালো মতো, 
ভালো (মন্দের বিপরীত), ভীরু, ভুঁড়ি,
ভুজ, ভুজঙ্গ, 
ভুবন।

স্বায়ত্তশাসন, স্মরণিকা, হয়তো, হা-পিত্যেশ, হৃৎপিণ্ড, হীনম্মন্যতা, হৃৎস্পন্নদ, হৃদ্‌রোগ,
অকালপক্ব, অগ্রহায়ণ, অঙ্কন, অঙ্গীভূত, অঙ্গুলি (কিন্তু আঙুল), অচিন্ত্য,
অঞ্জলি, অণু-পরমাণু, অদ্ভুত, অধীনস্থ, অনন্যোপায়, অনূর্ধ্ব, অন্তঃকরণ,
অন্তঃসত্ত্বা, অন্তঃসারশূন্য, অন্তর্ভুক্ত, অন্তর্ভূত, অন্ধকূপ, অন্বেষণ,
অপরাহ্ণ, অর্পণা, অপাঙ্‌ক্তেয়, অভিভূত, অমাবস্যা, অলঙ্ঘ্য,
আঁকাবাঁকা, আঁটোসাঁটো, আঁধার (অন্ধকার), আধার (স্থান)
আকাঙ্ক্ষা, আনুষঙ্গিক, আন্তঃরাষ্ট্রীয়, আপৎকালীন,
অবির্ভাব, আবিষ্কার, আমূল, আয়ত্ত,
আর্দ্র, আশিস্‌।
 


·         শব্দের মধ্যাংশে বিসর্গ/২

নিঃসম্পাত, নিঃসম্বল, নিঃসহায়, নিঃসাড়, নিঃসারণ, নিঃস্ব, নিঃস্বার্থ, নিঃস্বীকরণ,
পয়ঃপ্রণালী, পুনঃপুন, পুনঃপ্রবেশ, পৌনঃপুনিক, প্রাতঃকাল, প্রাতঃকৃত্য,
প্রাতঃক্রিয়া, প্রাতঃপ্রণাম, প্রাতঃসন্ধ্য, বয়ঃপ্রাপ্ত, বয়ঃসন্ধি, বয়ঃস্থ,
বহিঃপ্রকাশ, বহিঃশত্রু, বহিঃশুল্ক, বহিঃসমুদ্র, বহিঃস্থ,
মনঃকল্পিত, মনঃকষ্ট, মনঃক্ষুণ্ন, মনঃক্ষোভ,
মনঃপীড়া, মনঃপুত, মনঃপ্রাণ,
যশঃকীর্তন, শিরঃপীড়া,
শিরঃশূল।


অতঃপর, অধঃকৃত, অধঃক্রম, অধঃক্ষেপণ, অধঃপতন,
অন্তঃসত্ত্বা, অন্তঃসলিলা, অন্তঃসার, তপঃক্লেশ,
নিঃশব্দ, নিঃশর্ত, নিঃস্নেহ,
অন্তঃরাষ্ট্রিক।


শব্দের মধ্যাংশে বিসর্গ:
অন্তঃস্থ, ইতঃপর, ইতঃপূর্বে, উচ্চৈঃস্বরে, চক্ষুঃশূল, চতুঃসীমা, ছন্দঃপতন,
জ্যোতিঃপুঞ্জ, অন্তঃপুর, অন্তঃক্রীড়া, অন্তঃকোণ, অন্তঃকরণ, অধঃস্থ,
অধঃপতিত, অন্তঃশত্রু, দুঃশাসন, দুঃসংবাদ, দুঃসময়,
দুঃসাধ্য, দুঃসহ, দুঃস্বপ্ন, দুঃসাহসিক, দুঃস্থ, 
নিঃশঙ্ক, নমঃশুদ্র, নিঃশ্মশ্রু, নিঃশ্রেণি, 
নিঃসংকোচ, নিঃসংশয়, নিঃসঙ্গ, 
নিঃসন্তান, নিঃশ্বাস
নিঃসন্দেহ, 
নিঃস্ব।

প্রাতঃকৃত, প্রাতঃক্রিয়া, প্রাতঃস্নান, প্রাতঃস্মরণীয়, বয়ঃক্রম, বয়ঃসন্ধি,
বহিঃপ্রকাশ, বহিঃশুল্ক, বহিঃসমুদ্র, মনঃকষ্ট, মনঃক্ষুণ্ন,
মনঃপীড়া, মনঃপুত, মনঃপ্রাণ, মনঃসংযোগ,
মনঃসমীক্ষা, শিরঃপীড়া, স্বতঃপ্রবৃত্ত
স্বতঃপ্রণোদিত, স্বতঃসিদ্ধ
স্বতঃস্ফূর্ত।
 

অতঃপর, অধঃপতন, অন্তঃকরণ, অন্তঃকোণ, অন্তঃক্রীড়া, অন্তঃপুর, অন্তঃরাষ্ট্রিক,
অন্তঃসার, দুঃশাসন, দুঃসংবাদ, দুঃসময়, দুঃসহ, দুঃসাহস, দুঃস্বপ্ন,
নিঃশঙ্ক, নিঃশব্দ, নিঃশর্ত, নিঃশেষ, নিঃসঙ্কোচ, নিঃসংশয়,
নিঃসঙ্গ, নিঃসন্তান, নিঃসন্দেহ, নিঃসম্বল, নিঃসরণ,
নিঃসহায়, নিঃসাড়, নিঃসীম, পয়ঃপ্রণালি, 
পুনঃপুন, পুনঃপ্রবেশ, পৌনঃপুনিক, 
প্রাতঃকাল।

শব্দের মধ্যাংশে বিসর্গ/৩:

সদ্যঃকৃত, সদ্যঃপক্ব, সদ্যঃপ্রবিষ্ট, সদ্যঃপ্রসূত, সদ্যঃস্নাত, মনঃসংযোগ,
স্বতঃপ্রবৃত্ত, স্বতঃপ্রকাশিত, স্বতঃপ্রণোদিত, মনঃসমীক্ষা,
স্বতঃপ্রমাণিত, স্বতঃস্ফূর্ত, মনঃস্থ, নিঃস্পৃহ,
স্রোতঃপথ, বয়ঃকনিষ্ঠ, বক্ষঃস্থল, 
প্রাতঃস্মরণীয়, প্রাতঃস্নান,
নিঃসীম, নিঃসৃত,
নিঃস্রাব।



বিসর্গ দেবেন; কিন্তু দেবেন না:
অন্তঃকরণ কিন্তু অন্তরঙ্গ; অন্তঃপুর কিন্তু অন্তরীণ;
অন্তঃসার কিন্তু অন্তরাল; নিঃশঙ্ক কিন্তু নিসর্গ;
নিঃশেষ কিন্তু নিষেধ; নিঃসৃত কিন্তু নিসৃষ্ট
প্রাতঃকাল কিন্তু প্রাতরাশ।

বক্ষঃস্থল কিন্তু বক্ষ্যমাণ, বয়ঃক্রম কিন্তু বয়োধর্ম
বয়ঃসন্ধি কিন্তু বয়োবৃদ্ধ; মনঃকষ্ট কিন্তু মনস্তত্ত্ব
মনঃক্ষুণ্ন কিন্তু মনোদুঃখ; মনঃসংযোগ কিন্তু মনোবিজ্ঞান
স্বতঃসিদ্ধ কিন্তু স্বতবিরোধ।


অন্তঃকরণ কিন্তু অন্তরঙ্গ; অন্তঃপুর কিন্তু অন্তরীণ;
অন্তঃসার কিন্তু অন্তরাল; নিঃশঙ্ক কিন্তু নিসর্গ;
নিঃশেষ কিন্তু নিষেধ; নিঃসৃত কিন্তু নিসৃষ্ট
প্রাতঃকাল কিন্তু প্রাতরাশ।


শব্দের শেষের বিসর্গ দেবেন না:
শব্দের শেষের বিসর্গ উচ্চারিত হয় না। তাই আধুনিক বাংলা বানানে বিস্ময়সূচক শব্দ ছাড়া (আঃ উঃ)
অন্ত্য-বিসর্গ বর্জিত। যেমন:
প্রথমত, অন্তত, অংশত, ইতস্তত, ক্রমশ, তৃতীয়ত, প্রায়শ,
নভ, পয়, প্রথমত, প্রধানত, বক্ষ, বস্তুত, গৌণত, তপ,
বিশেষত, মুখ্যত,যশ, সাধারণত, প্রকাশ্যত,
স্বত, স্বভাবত ইত্যাদি।
সন্ধিজাত শব্দের মধ্যাংশে /স্ত, স্থ, স্প, শ্ব, স্র/ যুক্তব্যঞ্জনগুলোর পূর্বে অবস্থিত বিসর্গ বিকল্পে লুপ্ত হতে পারে।
এসব ক্ষেত্রে বিসর্গ না দিলেও বানানে ভুল হয় না। যেমন:
অন্তস্থ, নিস্তব্ধ, নিস্পন্দ, নিস্পৃহ, দুস্থ,
মনস্থ, বক্ষস্থল, বয়স্থ, নিশ্বাস,
নিস্রাব, বহিস্থ।


হস্‌-চিহ্ন দিতে হবে/নইলে বানান ভুল হবে:
নিচে কয়েকটি শব্দ দেয়া হল, শব্দগুলোতে হস্‌-চিহ্ন দিতে হবে।
উদ্‌ঘাটন, উদ্‌বেগ, উদ্‌ভ্রান্ত, উদ্‌যাপন, দিক্‌পাল,
দিক্‌ভ্রম, দিক্‌ভ্রষ্ট, দিগ্‌দর্শন,
প্রাক্‌-কথন, বাক্‌-সর্বস্ব, 
বাগ্‌বিতণ্ডা,
বাগ্‌দেবী।


Friday, July 21, 2017

জাদুকর না কি যাদুকর / ড. মোহাম্মদ আমীন


বাংলা একাডেমির অভিধানে প্রথামে 'যাদু' বানান প্রমিত ছিল। পরবর্তীকালে সেটা সংস্কার করে 'জাদু' শব্দকে প্রমিত করা হয়েছে। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রণীত ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের বাংলা বানানের নিয়মে বলা আছে অসংস্কৃত (তদ্‌ভব, দেশি ও বিদেশি) শব্দে 'য' না লিখিয়া 'জ' লেখা বিধেয়। অতএব 'জাদুকর' বানানই প্রমিত। 

Thursday, July 20, 2017

হাইফেন এর ব্যবহার / ড. মোহাম্মদ আমীন


বাংলা ভাষায় বহুল ব্যবহৃত যতি চিহ্নের মধ্যে হাইফেন অন্যতম। বাক্যের সঙ্গে নয়, শব্দের সঙ্গে হাইফেনের সম্পর্ক। এটি দেখতে ড্যাশের মত হলেও দৈর্ঘ্যে ড্যাশের চেয়ে ছোট। এর ব্যবহার বিরামচিহ্নের ন্যয় নয়। শব্দের বর্ণসমষ্টির সংযোগ প্রকাশের জন্য হাইফেন ব্যবহার করা হয়। হাইফেনে কোন বিরাম দিতে হয় না।
১. বাক্যস্থ সমাসবদ্ধ পদে হাইফেনের বহুল ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। হাইফেন দিয়ে সমাসবদ্ধ পদ চিহ্নিত করা হয়। যেমন: আম-জাম-কলা সবগুলো লাল-পাত্রে রাখা হয়েছে।
২.অনুগামী ও অনুকার শব্দে হাইফেন বসাতে হয়। যেমন: মাল-পত্র গাড়িতে তোল। ডর-ভয় বলতে তোমার কিছু নেই।
৩. দুই বা দুইয়ের বেশি পদের সমাসে সাধারণত হাইফেন বসে। যেমন: বাপে-পুতে লড়াই, কে কারে ডরাই। আমি-তুমি-সে। টাকা-পয়সা-ধন-দৌলত, যা আছে নে। উল্লেখ্য দ্বন্দ্ব সমাস ছাড়াও অন্যান্য সমাসবদ্ধ পদে হাইফেন বসানো যায়। যেমন: আল্লাহ-সৃষ্ট ।
৪. দুইয়ের বেশি শব্দ মিলিত হয়ে একটি শব্দ গঠন করলে হাইফেন বসানো হয়। শব্দের দ্বিত্ব ঘটলে হাইফেন ব্যবহার করা হয়। যেমন: ঝগড়া-রত- বুড়ো-লোক, কেঁদে-কেঁদে দেখায় শোক।
৬.যেখানে সন্ধি সম্ভব নয় কিংবা সন্ধি করা উচিত নয় সেখানে হাইফেন বসে। যেমন: মহা-প্রলয়ে যেন শেষ হয়ে যাবে ধরা।
৭. যৌগিক ক্রিয়া বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হলে শব্দে হাইফেন বসে। যেমন: দম-বন্ধ-হয়ে আসা রোগি।
৮. ক্রিয়া বিশেষণে শব্দের দ্বিত্ব হলে হাইফেন বসে। যেমন: যেতে-যেতে পথে, পূর্ণিমা রাতে-..।
৯.বহুবর্ণযুক্ত দুটি শব্দের মধ্যে সমাস হলে হাইফেন ব্যবহার করা হয়। যেমন: পুষ্পভারনত-বৃক্ষ, ক্ষত্রিয়সুলভ-আচরণ।
১০.দপ্তর, অধিদপ্তর, প্রতিষ্ঠান ও পদের মধ্যে হাইফেন বসে। যেমন: প্রধান-মন্ত্রী, কৃষি-মন্ত্রী, শিক্ষা-সচিব, উপ-সচিব, যুগ্ম-সচিব ইত্যাদি।
১১. সংখ্যা প্রকাশে অনেক সময় হাইফেন ব্যবহৃত হয়। জার্মানি ৮-০ গোলে সৌদি আরবকে হারায়। মহিলাটি ৬-ফুট লম্বা।
১২. স্থান, অনুষ্ঠান এবং দিক নির্দেশের ক্ষেত্রে শব্দে হাইফেন বসে। যেমন: সিমলা-চুক্তি, কাশ্মীর-সমস্যা, পূর্ব-পশ্চিম ইত্যাদি।
পুনশ্চ: শহিদুল হকের ভাষায় বলা যায়, নির্বাচিত শব্দের মাধ্যমে মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করে। প্রকাশিত ভাব যখন সংরক্ষণ আবশ্যক হয় তখন তার জন্য বিশেষ চিহ্নসমষ্টির প্রয়োজন হয়। এই সংরক্ষণ কর্ম যার যত সুন্দর সে তত বড় শিল্পী। শৈল্পিক কাজে শব্দের সর্বাঙ্গীন র্সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য হাইফেনের ব্যবহারটা কখনও কখনও জরুরি হয়ে পড়ে বৈ কি

দ্বন্দ্ব সমাস / ড. মোহাম্মদ আমীন


দ্বন্দ্ব শব্দের আভিধানিক অর্থ বিরোধ, কলহ, ঝগড়া, বিবাদ, ‍যুদ্ধ , মল্লযুদ্ধ, জোড়া, যুগল, মিথুন ,ও সমাসবিশেষ। দ্বন্দ্ব সমাসে প্রত্যেক পদের অর্থপ্রাধান্য থাকে। দ্বন্দ্ব সমাস মূলত সমপ্রাধান্যপূর্ণ উভয় পদের সমাস। এই সমাসে দুটো পদকে অর্থ ঠিক রেখে জোড়া বেঁধে দেওয়া হয়। সুতরাং দ্বন্দ্ব শব্দের আভিধানিক অর্থ জোড়া হিসেবেই জানলে বুঝতে সহজ হবে।সংজ্ঞা: যে সমাসে প্রত্যেকটি সমস্যমান পদের অর্থপ্রাধান্য থাকে এবং সংযোজক অব্যয়লোপে সমস্ত পদ হয়, তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন- নদী ও নালা= নদী-নালা, এখানে নদী পূর্বপদ ও নালা পরপদ। দুটি পদেরই অর্থের প্রাধান্য সমস্ত পদে রক্ষিত হয়েছে।
দ্বন্দ্বসমাসের নিয়মাবলি:
১. দ্বন্দ্ব সমাসে অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের পদটি আগে বসে। যেমন- মা ও বাবা= মা-বাবা।
২. পূর্বপদ ও পরপদ উভয় পদ বিশেষ্য। যেমন- ছেলে ও মেয়ে= ছেলে-মেয়ে, ভাই ও বোন= ভাই-বোন ইত্যাদি।
৩. পূর্বপদ ও পরপদ উভয় পদ বিশেষণ হয়। যেমন- ধনী ও গরিব= ধনী-গরিব, কাঁচা ও পাকা= কাঁচা-পাকা ইত্যাদি।
৪.পূর্ব ও পরপদ উভয় পদ ক্রিয়াপদ হয়। যেমন- ভাঙে ও গড়ে= ভাঙে-গড়ে, নাচ ও গান= নাচ-গান ইত্যাদি।
৫. পূর্ব ও পরপদ উভয় পদ সর্বনাম। যেমন- যাকে ও তাকে= যাকে-তাকে, তুমি ও আমি= তুমি-আমি ইত্যাদি।
স্মরণীয়: সমস্ত পদ= পূর্ব পদ+ব্যাসবাক্য সহায়ক পদ( সংযোজক অব্যয়-ও/এবং/আর)+ পরপদ

কর্মধারায় সমাস / ড. মোহাম্মদ আমীন


যেখানে বিশেষণ (বা বিশেষণভাবাপন্ন ) পদের সাথে বিশেষ্য (ও বিশেষ্যভাবাপন্ন) পদের যে সমাস হয় এবং পরপদের অর্থই প্রদানরূপে প্রতীয়মান হয় তাকে কর্মধারয় সমাস বলে। পুনশ্চ: কর্মধারয় সমাসে সমান বিভক্তিযুক্ত বিশেষণ ও বিশেষ্য কিংবা বিশেষ্য কিংবা বিশেষণ পদের মিলন হয় এবং পরপদে বিশেষ্যের অর্থ প্রধান হয়। যেমন- নীল যে পদ্ম= নীলপদ্ম।সহজ উদাহরণ হল- এই সমাস পিতৃতান্ত্রিক সমাস। পিতা ও মাতা কিংবা মাতা ও পিতার মিলনে সৃষ্ট সন্তান আমাদের সমাজে পিতার নামেই যেমন পরিচয় লাভ করে এই সমাসেও তদ্রুব বিশেষণ ও বিশেষ্য মিলিত হয়ে বিশেষ্যেরই প্রাধান্যতা সৃষ্টি করে।
নিয়মাবলী:
১. কর্মধারয় সমাসে সাধারণত বিশেষণ পদ আগে বসে। যেমন- পরম যে ধার্মিক= পরমধার্মিক, খাস যে মহল= খাসমহল , ফুল যে হাতা= ফুলহাতা ইত্যাদি।
২.কর্মধারয় সমাসে সাধারণত যে-সে, যেই-সেই, যা-তা , যিনি-তিনি, ন্যায়, সদৃশ্য, রূপ , মতো, মতন ইত্যাদি ব্যাসবাক্য ব্যবহৃত হয়। যেমন- যে শান্ত সেই শিষ্ট= শান্তশিষ্ট।
৩. দুটি বিশেষ্য পদে একই ব্যক্তি বা বস্তু বোঝালেও কর্মধারয় সমাস হয়। যেমন- যিনি জজ তিনিই সাহেব= জজসাহেব।
৪. কাজের ধারাবাহিকতা বোঝালে বা পরপর ঘটলে কৃদন্ত বিশেষণ পদেও কর্মধারয় সমাস হয়। যেমন- আগে ধোয়া পরে মোছা= ধোয়ামোছা।
৫. কর্মধারয় সমাসে বিশেষণ পুরুষ লিঙ্গের রূপ ধারণ করে। যেমন- সুন্দরী যে লতা= সুন্দরলতা। মহতী যে কীর্তি= মহৎকীর্তি। এটাও পুরুষতান্ত্রিকতার প্রভাব কি না জানি না।
৬. বিশেষণবাচক ‘মহান’ ও ‘মহ’ৎ পূর্বপদ হলে এর পরিবর্তে ‘মহা’ হয়।যেমন- মহান যে নবী=মহানবী, মহৎ যে জ্ঞান= মহাজ্ঞান ইত্যাদি।
৭. পরপদে ‘রাজা‘ শব্দ থাকলে তা ‘রাজ‘ হয়। যেমন- মহান যে রাজা= মহারাজ।
৮. ‘রাত্রি‘ স্থলে ‘রাত‘ হয়। যেমন- দীর্ঘ যে রাত্রি= দীর্ঘরাত।
৯. পূর্বপদে ‘কু‘ বিশেষণ থাকলে এবং স্বরবর্ণ পরে থাকলে ‘কু‘ স্থলে ‘কৎ হয়। যেমন- কু(কৎ) যে আকার= কদাকার, কু(কৎ) যে আচার= কদাচার ইত্যাদি।
১০. ‘অহ‘ শব্দের স্থলে ‘আন‘ হয়। যেমন- পূর্ব যে অহ=পূর্বাহ্ন ইত্যাদি।
১১, ছড়ায় ব্যবহৃত কুসুমকোমল= কুসুমের মতো কোমল, তুষারশীতল= তুষারের মতো শীতল উপমান কর্মধারয় সমাস। সিংহাসন= সিংহ চিহ্নিত যে আসন, রাষ্ট্রনীতি= রাষ্ট্রপরিচালনার নীতি প্রীতিভোজ= প্রীতি উপলক্ষ্যে ভোজ মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস। ঝরাপাতা= ঝরা যে পাতা , ফুলহাতা= ফুল যে হাতা, খাসমহল= খাস যে মহল সাধারণ কর্মধারয় সমাস।

বহুব্রীহি সমাস / ড. মোহাম্মদ আমীন


যে সমাসে সমস্যমান পদগুলোর কোনোটির অর্থ প্রধানভাবে না বুঝিয়ে সমাসবদ্ধ পদটিতে অন্য কোনো অর্থ বোঝায়, তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে। অথচ দ্বন্দ্ব সমাসে সমস্যমান পদের অর্থপ্রাধান্য থাকে।
মনে রাখতে হবে:
১. বহ্রব্রীহি সমাসে সমস্যমান পদগুলোর কোনটির অর্থের প্রাধান্য পায় না, সমস্যমান পদের সাথে সম্পর্কিত তৃতীয় পদের অর্থ প্রাধান্য পায়। যেমন- ‘বহু’ অর্থ অনেক এবং ‘ব্রীহি’ অর্থ ধান। কিন্তু বহুব্রীহি সমাসে এর কোনটি না বুঝিয়ে অনেক ধানের বা সম্পদের মালিক এমন ব্যক্তিকে বুঝিয়েছে। বহু ব্রীহি আছে যার= বহুব্রীহি।
২. এরূপ সমাসে ব্যাসবাক্যে সর্বনাম ‘যে’ শব্দের ‘যা’ ‘যায়’ ‘যাতে’ ‘যার’ ইত্যাদি বিভিন্নরূপের প্রয়োগ হয়। যেমন- তিন পায়া যার= তেপায়া, বিনয়ের সহিত বর্তমান= সবিনয়ে, গলায় গলায় যে মিল=গলাগলি, হাতে হাতে যে লড়াই= হাতাহাতি, কানে কানে যে কথা=কানাকানি ইত্যাদি।
৩.‘সহ’ কিংবা ‘সহিত’ শব্দের সঙ্গে অন্য পদের বহুব্রীহি সমাস হলে ‘সহ’ ও ‘সহিত’ এর স্থলে ‘স’ হয়। যেমন- বান্ধবসহ বর্তমান= সবান্ধব, সহ উদর যার= সহোদর ইত্যাদি।
৪. বহুব্রীহি সমাসে পরপদে মাতৃ, পত্নী, পুত্র, স্ত্রী ইত্যাদি শব্দ থাকলে এ শব্দগুলোর সঙ্গে ‘ক’ যুক্ত হয়। যেমন- নদী মাতা যার= নদীমাতৃক, স্ত্রীর সাথে বর্তমান= সস্ত্রীক ইত্যাদি।
৫. বহুব্রীহি সমাসে সমস্ত পদে ‘অক্ষি’ শব্দের স্থলে ’অক্ষ’, ‘নাভি’ শব্দের ’নাভ’ হয়। যেমন – কমলের ন্যায় অক্ষি যার= কমলাক্ষ, পদ্ম নাভিতে যার= পদ্মনাভ ইত্যাদি।
৬. বহুব্রীহি সমাসে পরপদে ‘জায়া’ থাকলে সমস্ত পদে ’জানি’ হয়। যেমন- যুবতী জায়া যার= যুবজানি। ‘চূড়া’ থাকলে ‘চূড়’ হয়। যেমন- চন্দ্র চূড়া যার= চন্দ্রচূড়। ’কর্ম’ থাকলে ’কর্মা’ হয়। যেমন- বিচিত্র কর্ম যার= বিচিত্রকর্মা ইত্যাদি।
৭. ‘সমান’ শব্দের স্থলে ‘স’ এবং ‘সহ’ হয়। ‘গন্ধ’ শব্দের স্থলে ‘গন্ধি’ বা ‘গন্ধা’ হয়। যেমন- সমান কর্মী যে= সহকর্মী, সমান বর্ণ যার=সমবর্ণ, সুগন্ধ যার= সুগন্ধি, মৎস্য গন্ধ যার= মৎস্যগন্ধা ইত্যাদি।
৮. মূলত বহ্রব্রীহি সমাসে সমস্যমান পদগুলোর মিলনে নতুন একটি শিশু বা বাচ্চা শব্দের জন্ম হয়। যার সাথে সমস্যমান পদের চেহারার মিল থাকলেও অর্থের মিল থাকে না। তাই একে শিশু বা বাচ্চা সমাস বললেই মনে হয় ভালো হয়।